বড় অংকের একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (এমঅ্যান্ডএ) চুক্তির দিক থেকে নতুন রেকর্ড গড়েছে ২০২৫ সাল। এছাড়া শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হয়েছে অনেক ইউনিকর্ন ও বড় কোম্পানি। এসব এমঅ্যান্ডএ ও আইপিও থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করেছে ওয়াল স্ট্রিট-কেন্দ্রিক বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো। চলতি বছরও এসব কার্যক্রমে দেয়া পরামর্শক সেবা থেকে বিনিয়োগ ব্যাংকের আয়ে বড় অংকের প্রবৃদ্ধি দেখা যাবে বলে প্রত্যাশা বিনিয়োগ ব্যাংকারদের। খবর রয়টার্স।
বছরের শুরুতেই ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) শক্তিশালী মুনাফার তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যাংকগুলো। এ সময় গোল্ডম্যান স্যাকসের বিনিয়োগ ব্যাংকিং ফি বাবদ আয় বেড়েছে ২৫ শতাংশ। প্রতিদ্বন্দ্বী মর্গান স্ট্যানলির এ বাবদ আয় বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রমে পরামর্শক সেবা দিয়ে রেকর্ড পরিমাণে আয় করেছে সিটিগ্রুপ।
এমঅ্যান্ডএ ও আইপিও থেকে কনসালট্যান্সি বাবদ আয়ের এ ধারা চলতি বছরেও দেখা যাবে বলে প্রত্যাশা মর্গান স্ট্যানলির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা শ্যারন ইয়েশায়ার। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘পাইপলাইনে এখনো অনেক এমঅ্যান্ডএ চুক্তি ও আইপিও কার্যক্রম অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা ও শিল্প খাতে আরো বেশি চুক্তি সই হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করছি।’
বৃহৎ অন্য বড় ব্যাংকগুলোর নির্বাহীরাও বলেছেন, এমঅ্যান্ডএ চুক্তির পাইপলাইন এখনো বেশ সক্রিয় আছে। যদিও কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রান্তিক প্রতিবেদনে উঠে আসা আর্থিক পারফরম্যান্স বিশ্লেষকদের প্রত্যাশামাফিক হয়নি।
ব্যাংক অব আমেরিকার বিনিয়োগ ব্যাংকিং ফি গত প্রান্তিকে বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ। জেপি মরগান চেজেরও এ বিনিয়োগ ব্যাংকিং ফি বাবদ আয় প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশামাফিক হয়নি। এর একটি বড় কারণ ২০২৫ সালের কিছু এমঅ্যান্ডএ চুক্তির কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হয়ে ২০২৬ সালে সরে আসা। তবে ডিলোজিকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শিল্প খাতে এ বাবদ সর্বোচ্চ ফি আয় করেছে জেপি মরগান।
ডিলোজিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংক খাতের আয়ের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। উচ্চ সুদহার ও বাজার অস্থিরতার কারণে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কয়েক বছর বেশ চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেছে বিনিয়োগ ব্যাংক খাত। তবে গত বছর সে ধারা কাটিয়ে প্রত্যাশামাফিক পুনরুদ্ধার ও রেকর্ড আয় করে খাতটি। এজন্য ২০২৫ সালকে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংক খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর বছর হিসেবে দেখছেন ব্যাংকাররা।
জেপি মরগান চেজের প্রান্তিক আয় প্রতিবেদন প্রকাশ হয় গত মঙ্গলবার। এরপর বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক কলে জেপি মরগানের সিএফও জেরেমি বার্নাম বলেন, ‘২০২৬ সালে আমরা শক্তিশালী গ্রাহক সম্পৃক্ততা ও চুক্তি কার্যক্রম প্রত্যাশা করছি। আমাদের পাইপলাইনে থাকা চুক্তিগুলোয়ই এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।’
এছাড়া অনেকগুলো হাইপ্রোফাইল কোম্পানি আইপিওতে আসার অপেক্ষায় রয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যে উঠে এসেছে। ২০২৬ সালে আইপিওতে আসার অপেক্ষায় থাকা হাইপ্রোফাইল কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআই, ইলোন মাস্কের রকেট স্টার্টআপ স্পেসএক্স ও এআই চিপ নির্মাতা সেরেব্রাস।
গ্যাবেলি ফান্ডসের পোর্টফোলিও ম্যানেজার ম্যাক্রে সাইকস বলেন, ‘আমি মনে করি, আইপিও ইস্যু এবং এমঅ্যান্ডএ ঘোষণা ও চুক্তির দিক থেকে ২০২৬ সাল একটি খুবই শক্তিশালী বছর হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির স্বাস্থ্য, শিথিল নিয়ন্ত্রণ ও ২০২৫ সালে ফেডের সুদহার কর্তনের ধারাবাহিকতায় মূলধন ব্যয় কমে আসার প্রভাব—সবই বাজারে এমঅ্যান্ডএ এবং আইপিওর জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতে অনুকূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।’
বড় অংকের এমঅ্যান্ডএ চুক্তি ও আইপিওর শক্তিশালী প্রবাহের কারণে ২০২৫ সালে এসব খাত থেকে আয় বিনিয়োগ ব্যাংকারদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহৎ বৈশ্বিক অর্থনীতিগুলোর ওপর ব্যাপক মাত্রায় শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়ার পর বাজার ও বিনিয়োগপ্রবাহ থমকে দাঁড়ানোর বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক কলে গত বুধবার ওয়েলস ফার্গোর সিইও চার্লি শার্ফ বলেন, ‘২০২৬ সালের শুরুতে আমাদের এমঅ্যান্ডএ চুক্তির পাইপলাইন বিগত পাঁচ বছরের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি শক্তিশালী। যদিও বাজার পরিস্থিতি যেকোনো সময় বদলাতে পারে।’
প্রাইভেট ইকুইটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডগুলো বিগত কয়েক বছরের পরিস্থিতি কিছুটা প্রতিকূল ছিল। এ সময় তারা বাজার দুর্বলতার কারণে বড় অংকের বিনিয়োগগুলো থেকে মুনাফা তুলে নিতে পারেনি। বরং অনুকূল পরিস্থিতির অপেক্ষায় এ সময় বাজারে অনেক সতর্ক পর্যবেক্ষণ চালাতে হয়েছে তাদের। তবে এখন পরিস্থিতি বদলেছে। বাজারে আস্থা ফিরেছে। বিনিয়োগকৃত কোম্পানিগুলোর মূল্যায়নও হচ্ছে আগের চেয়ে বেশি। আবার বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীর চাহিদাও বাড়ছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রাইভেট ইকুইটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডগুলো এখন মুনাফা তুলে নেয়ার মতো অনুকূল পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছে। বিগত ২০২৫ সালেই বড় অংকের লেনদেন ও মেগাডিলের প্রত্যাবর্তন ঘটতে দেখা গেছে। চলতি ২০২৬ সালে এসব প্রাইভেট ইকুইটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডগুলোর সক্রিয়তা আরো বাড়তে পারে। এতে আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী কোম্পানির সংখ্যা বাড়বে। একই সঙ্গে বাড়তে যাচ্ছে বড় বড় করপোরেট চুক্তিও।
২০২৫ সালের শেষ দিকে হঠাৎ করেই এমঅ্যান্ডএ চুক্তির জোয়ার দেখা যায়। এ সময় ওয়াল স্ট্রিট থেকে ক্যানারি ওয়ার্ফ পর্যন্ত ব্যাংকার ও পরামর্শকদের ছুটির মধ্যেও কাজ করতে দেখা গেছে।
স্ট্রিমিং জায়ান্ট নেটফ্লিক্স ও প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের টানাপড়েনে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির অধিগ্রহণ কার্যক্রম এখন আরো জটিল হয়ে উঠেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ চুক্তি সফল হলে নিয়ন্ত্রক বাধা তুলনামূলক কম হওয়ায় আরো বড় অংকের এমঅ্যান্ডএ চুক্তির পথ আরো মসৃণ হয়ে আসবে।
ওয়েলস ফার্গোর জন্য বছরটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভোক্তা ঋণনির্ভরতা ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পাঁচ বিনিয়োগ ব্যাংকের একটি হওয়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
শার্ফ জানান, ব্যাংকটি ২০২৫ সালের বৃহদায়তনের দুটি এমঅ্যান্ডএ চুক্তিতে পরামর্শক সেবা দিয়েছে। এ সময় এমঅ্যান্ডএ র্যাংকিংয়ে আগের বছরের ১২তম স্থান থেকে অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে।